প্রশ্নোত্তরমাসায়েরমাহে রমজানহাদিসের বানী

রোজা রেখে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বিধান কি?

সুনানে ইবন মাজাহ ১৬৬৭, তিরমিযী ৭১৫, নাসায়ী ২২৭৪, ২২৭৬, ২৩১৫, আবূ দাউদ ২৪০৮

রোজা রেখে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বিধান কি?

প্রশ্নঃ আমার স্ত্রী আমার ১০ মাসের শিশু সন্তানকে দুগ্ধপান করান। তাঁর জন্যে কি রমজানের রোজা না-রাখা জায়েয হবে?

উত্তরঃ দুগ্ধপানকারিনী ও গর্ভবতী মায়ের দুইটি অবস্থা হতে পারেঃ প্রথমতঃ রোজা রাখার দ্বারা তার স্বাস্থ্যের উপর কোন প্রভাব না পড়া। অর্থাৎ তার জন্য রোজা রাখাটা কষ্টকর না হওয়া এবং তার সন্তানের জন্যেও আশংকাজনক না হওয়া। এমন নারীর উপর রোজা রাখা ফরজ; তার জন্য রোজা ভাঙ্গা নাজায়েয। তাই আসুন আজকে হাদিসের আলোকে জেনে নেই রোজা রেখে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বিধান কি?

দ্বিতীয়তঃ রোজা রাখলে তার নিজের স্বাস্থ্য অথবা সন্তানের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার আশংকা করা এবং তার জন্যে রোজা রাখাটা কষ্টকর হওয়া। এমন নারীর জন্য রোজা না-রাখা জায়েয আছে; তিনি এ রোজাগুলো পরবর্তীতে কাযা পালন করবেন। বরং অবস্থায় এ নারীর জন্য রোজা না-রাখাই উত্তম; রোজা রাখা মাকরূহ।

হাদীস শরীফে এসেছে, নবীজী ﷺ বলেছেনঃ

إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَضَعَ عَنْ الْمُسَافِرِ شَطْرَ الصَّلَاةِ وَعَنْ الْمُسَافِرِ وَالْحَامِلِ وَالْمُرْضِعِ الصَّوْمَ
অর্থঃ আল্লাহ্ তাআলা মুসাফির থেকে অর্ধেক নামাজ হ্রাস করেছেন এবং মুসাফির, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারিণীকে রোজা রাখার ব্যাপারে অবকাশ দিয়েছেন। (সুনানে ইবন মাজাহ ১৬৬৭, তিরমিযী ৭১৫, নাসায়ী ২২৭৪, ২২৭৬, ২৩১৫, আবূ দাউদ ২৪০৮)

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) ফাতাওয়া আল-সিয়াম গ্রন্থে (পৃষ্ঠা- ১৬১) বলেনঃ

যদি গর্ভবতী ও দুগ্ধপানকারিনী নারী শারীরিকভাবে সবল ও কর্মোদ্যমী হয়, রোজা রাখার দ্বারা তার স্বাস্থ্যের উপর কোন প্রভাব না পড়ে; তদুপরি কোন ওজর ছাড়া রোজা না-রাখে এর হুকুম কি?
তিনি উত্তরে বলেনঃ
“গর্ভবতী ও দুগ্ধপানকারিনী নারীর জন্য কোন ওজর ছাড়া রমজান মাসের রোজা না-রাখা জায়েয নয়। যদি ওজরের কারণে রোজা না-রাখে তাহলে রোজা কাযা করতে হবে। দলিল হচ্ছে-
আল্লাহর বাণীঃ

অর্থঃ রোজা নির্দিষ্ট কিছু দিন। তাই তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ থাকে, বা সফরে থাকে, তাহলে পরে একই সংখ্যক দিন পূরণ করবে। আর যাদের জন্য রোজা রাখা ভীষণ কষ্টের, তাদের জন্য উপায় রয়েছে — তারা একই সংখ্যক দিন একজন গরিব মানুষকে খাওয়াবে। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাড়তি ভালো কাজ করে, সেটা তার জন্যই কল্যাণ হবে। রোজা রাখাটাই তোমাদের জন্যই ভালো, যদি তোমরা জানতে। [আল-বাক্বারাহ ১৮৪]

আর এ দুই শ্রেণীর নারী অসুস্থ ব্যক্তির পর্যায়ভুক্ত। যদি এ দুই শ্রেণীর নারীর ওজর হয় ‘তাদের সন্তানের স্বাস্থ্যহানির আশংকা’ তাহলে কোন কোন আলেমের মতে, এরা রোজাগুলোর কাযা পালনের সাথে প্রতিদিনের বদলে একজন মিসকীনকে গম, চাল, খেজুর বা স্থানীয় প্রধান কোন খাদ্য সদকা করবে। আর কোন কোন আলেমের মতে, কোন অবস্থাতে তাদেরকে কাযা পালন ছাড়া আর কিছু করতে হবে না। কারণ খাদ্য প্রদানের পক্ষে কিতাব ও সুন্নাহর কোন দলিল নেই। আর দলিল সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তি যে কোন প্রকার দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকা- মৌলিক বিধান। এটি ইমাম আবু হানিফার মাযহাব ও মজবুত অভিমত।

শাইখ উছাইমীনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল (ফাতাওয়াস সিয়াম পৃষ্ঠা-১৬২):

গর্ভবতী নারী যদি নিজের স্বাস্থ্যহানি বা সন্তানের স্বাস্থ্যহানির আশংকায় রোজা না রাখে এর কী হুকুম?

উত্তরে তিনি বলেনঃ

“আমাদের জবাব হচ্ছে- গর্ভবতী নারীর দুইটি অবস্থার কোন একটি হতে পারেঃ
১. শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও কর্মোদ্যমী হওয়া, রোজা রাখতে কষ্ট না হওয়া, গর্ভস্থিত সন্তানের উপর কোন প্রভাব না পড়া- এ নারীর উপর রোজা রাখা ফরজ। যেহেতু রোজা ছেড়ে দেয়ারজন্য তার কোন ওজর নেই।

২. গর্ভবতী নারী রোজা রাখতে সক্ষম না হওয়াঃ গর্ভ ধারণের কাঠিন্যের কারণে অথবা তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে অথবা অন্য যে কোন কারণে। এ অবস্থায় এ নারী রোজা রাখবে না। বিশেষতঃ যদি তার গর্ভস্থিত সন্তানের ক্ষতির আশংকা করে সেক্ষেত্রে রোজা ছেড়ে দেয়া তার উপর ফরজ। যদি সে রোজা ছেড়ে দেয় তাহলে অন্য ওজরগ্রস্ত ব্যক্তিদের যে হুকুম তার ক্ষেত্রেও একই হুকুম হবে তথা পরবর্তীতে এ রোজাগুলো কাযা পালন করা তার উপর ফরজ। অর্থাৎ সন্তান প্রসব ও নিফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পর এ রোজাগুলো কাযা পালন করা তার উপর ফরজ। তবে কখনো হতে পারে গর্ভধারণের ওজর থেকে সে মুক্ত হয়েছে ঠিক; কিন্তু নতুন একটি ওজরগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, অর্থাৎ দুগ্ধপান করানোর ওজর। দুগ্ধপানকারিনী নারী পানাহার করার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়তে পারে; বিশেষতঃ গ্রীষ্মের দীর্ঘতর ও উত্তপ্ত দিনগুলোতে। এ দিনগুলোতে এমন নারী তার সন্তানকে বুকের দুধ পান করানোর জন্য রোজা ছেড়ে দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এমতাবস্থায় আমরা সে নারীকে বলব: আপনি রোজা ছেড়ে দিন। এ ওজর দূর হওয়ার পর আপনি এ রোজাগুলো কাযা পালন করবেন।”

শাইখ বিন বায (মাজমুউল ফাতাওয়া ১৫/২২৪) বলেনঃ

“গর্ভবতী ও দুগ্ধপানকারিনী নারীর ব্যাপারে ইমাম আহমাদ ও সুনান সংকলকগণের গ্রন্থে সহিহ সনদে আনাস বিন মালিক আল-কাবী এর বর্ণিত হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি এ দুই প্রকারের নারীকে রোজা ছেড়ে দেয়ার অবকাশ দিয়েছেন এবং এদেরকে মুসাফিরের পর্যায়ে গণ্য করেছেন। অতএব, জানা গেল যে, এরা মুসাফিরের মত রোজা না-রেখে পরবর্তীতে কাযা পালন করবে। আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, রোগীর অনুরূপ কষ্ট না হলে অথবা সন্তানের স্বাস্থ্যহানির আশংকা না থাকলে এ দুই শ্রেণীর নারীগণ রোজা ছেড়েদিবে না। আল্লাহই ভাল জানেন।” সমাপ্ত

স্থায়ী কমিটির ফতোয়াতে (১০/২২৬) এসেছেঃ

“গর্ভবতী নারীর উপরও রোজা রাখা ফরজ; তবে যদি রোজা রাখলে নিজের স্বাস্থ্যহানি অথবা গর্ভস্থিত সন্তানের স্বাস্থ্যহানির আশংকা হয় তাহলে তার জন্যে রোজা না-রাখার অবকাশ থাকবে এবং প্রসব করার পর নিফাস থেকে পবিত্র হয়ে এ রোজাগুলো কাযা করবে।”

মুফতিহ মুহাঃ মুহিব্বুল্লাহ আল মুঈন
কামিল ফিকহ্, ঝালোকাঠী এন এস কামিল মাদ্রাসা

আরও মাসয়ালা সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।

কুরবানির মাসয়ালা জানতে এখানে ক্লিক করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close